Friday, 15 March 2013

দীপাবলী ও অন্যান্য


রাস্তার মোড়ের বিল্ডিংটার তেতলার ছোট খুপরি ঘরটার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল জানালাটা । এখান দিয়ে এক চিলতে আকাশ দেখা যায় গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে । আর বিকেলবেলায় অসংখ্য টুটু পাখি এসে ভিড় করে গাছটায় ।ওদের চেঁচামেচিতে মাঝে মাঝে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হয় বলে বিরক্তও লাগে । রাতে ওই এক চিলতে আকাশে অরুণিমা খুঁজে নিতে  চেষ্টা করে  অরিয়ন এর বেল্টের ওই তিনটে তারাকে, যারা সবসময় একসঙ্গে থাকে । আর মাথার খুপরিতে অহর্নিশ ঘুরতে থাকা একটি মুখ, একটি অনুভূতিকে ভুলে যেতে চেষ্টা করে একই সাথে । কিন্তু তার সমস্ত চেষ্টা কে ব্যর্থ করে দিয়ে কেউ একজন বলে ওঠে, কিছু শুন্যতা কখনো পূরণ হয়না । কিছু অনুভূতি কখনো ভোলা যায়না ।

মাথার কাছে পড়ে থাকে জীবনানন্দ, সমরেশ, পূর্ণেন্দু পত্রী আর সদ্য পড়া একটি সুইসাইড নোট্ । কথোপকথন এর পাতা উল্টে চোখে পড়ল সোনালী কলমে লেখা একটি তারিখ । দিনটিকে মনে করবার চেষ্টা করতেই আবার ফিরে আসে সেই মুখ । তখন তার মনে হল নিজের, একান্ত নিজের বলে কিছুই কি ছিলনা তার  ! সব দিক থেকে যেন আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়ে আছে।

ফোন তুলে নিয়ে ভাবলো তার একজন আপন মানুষ যে কিনা নিতান্ত তার একার  তার সাথে কথা বলে । কল লগ ঘেঁটে খুঁজে বের করলো  শুচির নম্বর । কল বাটন চেপে ভাবতে থাকে এই মেয়েকে  ফোন করে কখনো পাওয়া যায়না । হঠাৎ স্ক্রিনে চোখ দিয়ে এক ঝটকায় কল কেটে দেয় সে । এটা তো শুচির নম্বর নয় !!ঘড়ি দেখে । রাত প্রায় দুটো । একটু আতঙ্কিত হল সে ।
-'ঘুম ভাঙিয়ে দিলামনা তো !"
 একবার ভাবলো  এসএমএস করে জানিয়ে রাখে  অনিচ্ছাকৃত ভুলের কথা ।পরে মনে হলো থাক তা  হয়ত আরেকটা বিরক্তির কারণ হবে মানুষটার।

এটা ওটা ভেবে ভেবে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে  মনে নেই ওর ।সকালে বালিশের তলায় রাখা ফোনের ভাইব্রেশন এ ঘুম ভেঙ্গে কিছু না দেখেই ফোন রিসিভ করতেই ওপাশে চেনা কন্ঠ ।

রাতে ফোন করেছিলে ?
- না আমি শুচি কে ফোন করতে যেয়ে ভুল করে ...
ও আচ্ছা, আমি ভাবলাম কোনো দরকার ছিল বোধহয়, রাখি তাহলে
- আচ্ছা

প্রচন্ড কষ্টে, অপরাধবোধে  কুঁকড়ে যেতে যেতে  ওর মনে হল সমস্ত ঘরে নিঃশ্বাস নেবার মত এতটুকু বাতাস নেই । মাথার পাশে রাখা সাতকাহন টেনে নিয়ে উল্টাতে থাকলো।  দীপাবলীর মত শক্ত হতে চেয়েছিল সে  কিন্তু দীপাবলীর জীবন তো সে  চায়নি ।

চোখ বন্ধ করে সে দেখতে পায় রুক্ষ চুলের একটি মেয়ে, ময়ুরকন্ঠী নীল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে খুব শান্ত একটি নদীর পাড় ঘেঁষে । নদীর শান্ত জলে ছায়া পড়েছে পাশের পাকুড় গাছটার । ঝাপসা চোখে মেয়েটি কারো একজনের চলে যাওয়া দেখে । চলে যাওয়া মানুষটার মুখে যেন একচিলতে বিদ্রুপের হাসি ।

হঠাৎ তার ময়ুরকন্ঠী শাড়ির নীল রঙগুলো খুলে পড়তে থাকে ...রঙগুলো গ্রাস করে মেয়েটির চোখ, মুখ, মন ..হয়ে যায় তার কপালের সূর্যের মত বড় টিপ ..

Saturday, 22 December 2012

স্মরণ

জীবন সবসময় পরিকল্পনা মাফিক চলেনা সেটা রমি প্রতি মুহুর্তে নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পারছে । তারপর ও সে স্বপ্ন দেখে । অবাস্তব কল্পনা করে ।গতকাল সে নিতান্ত প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছে । আর যত্ন করে গুছিয়ে নিয়েছে সমস্ত স্মৃতি । দীর্ঘ আট বছরের সংসার ছেড়ে ওকে চলে যেতে হচ্ছে । আবার যেন সেই হল লাইফ এর শুরু । শুধু দেশটা ভিন্ন । ও যার জন্য এই ভিনদেশে এসেছিল একগাদা স্বপ্ন চোখে নিয়ে সে আজ আর ওর  সাথে নেই । তাই স্বপ্নগুলো ও একাই বহন করে নিয়ে চলেছে । যদিও সেগুলো পূরণ করা আর সম্ভব নয় ।
বারান্দা থেকে windchimes গুলো সযত্নে খুলে নিল রমি । জিনিসপত্র গোছাবার এই পুরো সময়টা ওকে মানসিকভাবে  প্রচন্ড সহযোগিতা করেছে স্যালি, ওর ফ্ল্যাটমেট । নতুন যে বাসায় ও উঠবে, তাদের সাথে ও আগেই কথা বলে রেখেছিল । ওরা বলেছে বারান্দায় windchimes গুলো ঝোলাতে দেবে । সফটটয় গুলোকেও নিয়েছে সাথে । একবার ভেবেছিল বেবি pooh টা ছাড়া বাকি টয়  গুলো আরিশ কে দিয়ে দেবে । পরে মনে হলো  এগুলোর সাথে ওর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন আর স্মৃতি জড়িত । তাই যতদিন পারবে ও এগুলো কে বয়ে নিয়ে বেড়াবে । ওরা দুজনে অনেক খেলত baby pooh কে নিয়ে । আর নিয়েছে একটা ফুলদানী, অনুপমের দেওয়া উপহার । লাল ১০ টা টিউলিপ সহ ওই ফুলদানী টা রমিকে দিয়েছিল অনুপম । অষ্টম বিবাহবার্ষিকীতে ।

রমি ঠিক করেছে এখন থেকে যতদিন বেঁচে থাকবে প্রত্যেক ১১ ই এপ্রিল এ লাল ১০ টা টিউলিপ  কিনে এনে ওই ফুলদানীতে সাজাবে । প্রত্যেক ২২ শে অক্টোবর windchimes গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে দেখবে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জন্মদিনের উপহার । প্রত্যেক ৬ জুলাই কেক কিনে আনবে, মোমবাতি জ্বালবে, রান্না করবে। যদিও কেউ অফিস থেকে ফিরে ঘরে ঢুকেই বিরানির গন্ধে খুশি হয়ে উঠবেনা । আর প্রত্যেকটা বিশেষ দিনে বা অবিশেষ দিনে  অনুপম কে উদ্দেশ্য করে লিখবে চিঠি । ওই চিঠি পড়ার কেউ থাকবেনা সে জানে । তবুও লিখবে ।

Thursday, 20 December 2012

অপরাধবোধ



আমার অপরাধবোধ আমাকে একমুহুর্তের জন্য স্বস্তি দেয়না
আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনা
যদিবা দুচোখের পাতা এক হয় ঘুমের ঘোরে সেই স্পর্শ  আমাকে অস্থির করে তোলে
আমি বুঝতে পারিনা কি করবো
কি করে মুক্তি পাব এই কষ্ট থেকে
এই নির্বাসন থেকে মুক্তি কি মিলবেনা আমার ?
আমি অপেক্ষায় থাকবো
সেই সুদিনের ....

Saturday, 15 December 2012

খসে পড়া তারা

উঠোনের আলোগুলো নিভিয়ে দিয়ে ইজি চেয়ার টা টেনে নিল রমি । মিষ্টিদির বাড়ির এই জায়গাটা বেশ সুন্দর । আজ ভাগ্যক্রমে আকাশ পরিষ্কার ।মধ্যরাত হতে আর বেশি দেরী নেই । রমি তার মোবাইল এ সময় দেখল ।

 পাশের বাড়ির বাথরুম এ জ্বলা আলোটা ওকে বিরক্ত করছিল । ও চাচ্ছিল সবাই আলো  নিভিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক । রমি আজ একদম একা বসে থাকতে চায় । হঠাৎ করেই ও আজ বিকালে মিষ্টিদির এখানে চলে এসেছে । পরে আর যাওয়া হয়নি । তাতে অবশ্য ভালই হয়েছে । বাড়ি ফিরলে আজ আর এই খসে পড়া  তারার উৎসব দেখতে পেতনা ও । ও যে ফ্ল্যাট টাতে থাকে তার বারান্দা থেকে আকাশ দেখা যায় বটে কিন্তু আশেপাশের আলোর কারণে তারা খুব একটা চোখে পড়েনা । আজ geminid meteor shower হবার কথা । এই নিয়ে বেশ একটা হইচই পড়েছে । অন্তত ফেসবুক দেখে তাই মনে হয় ।

রমি এর আগে কখনো দেখেনি খসে পড়া তারা । শুনেছে মানুষের ইচ্ছা নাকি পূরণ হয় ওই সময় কিছু চাইলে । রমি এসব প্রচলিত কথায় বিশ্বাস করেনা।  তবে তারা দেখার অভ্যাস ওর আগেও ছিল । অনেক আগে । অনুপম এর সাথে পরিচিত হবার আগে । রমির বাবা ওকে বই কিনে দিতেন প্রচুর । তার মধ্যে একটি বই ছিল গ্রহ নক্ষত্রদের নিয়ে । রাশিয়া থেকে প্রকাশিত একটি বইয়ের অনুবাদ ছিল সেটি । অনুপমের সাথে পরিচিত হবার পর ও এমনভাবে নিজের জগত ছেড়ে অনুপমের জগতে মিশে গেল, যে নিজের বলতে ওর আর কিছুই থাকলোনা ।

অনুপম নিজেও তারা দেখতে অনেক পছন্দ করে । মহাকাশ নিয়ে ওর অনেক আগ্রহ । রমি ও ওর সাথে থাকতে থাকতে ওই জগতের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে নিজের অজান্তে । যদিও অনুপম সেটা বুঝত কিনা ও জানেনা । আকাশের দিকে তাকিয়ে ওর অনুপম এর চলে যাবার দিনের কথা মনে পড়ল । হয়ত ঠিক এই মুহুর্তে অনুপম ও অপেক্ষা করছে খসে পড়া তারার বৃষ্টি দেখার জন্য । রমি অদ্ভূত এক একাত্মতা বোধ করলো । কিন্তু অনুপম কি ভাবছে রমির কথা ?

না ভাবাটাই স্বাভাবিক । সে তো আর ভালবাসেনা ওকে । হয়ত ভাবছে নতুন কিছু । নতুন কোনো স্বপ্নের কথা । রমি একটানা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল । দেখছিল একসাথে থাকা ওই তিনটে তারাকে । ওদের দুজনের পছন্দের সেই তিনটে তারা । যারা সবসময় ওদের সাথে সাথে ঘুরত ।

হঠাৎ ছুটে গেল একটা তারা । খসে পড়া  তারা ।রমি একটা বর চেয়ে বসলো ইচ্ছাপূরণের দেবীর কাছে । পরক্ষনেই নিজের বোকামিতে  হেসে উঠলো । কারণ ও জানে কেউ পারবেনা ওর এই ইচ্ছা পূরণ করতে ।

রমি আরো অনেকক্ষণ বসে রইলো চুপচাপ । একটানা আকাশের দিকে তাকিয়ে ।

এবার একটু একটু ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে রমির । ও উঠে পড়ল । ঘরে যাবার আগে আরেকবার দেখে নিল আকাশটা । ইচ্ছাপূরণের দেবীরা আজ সারারাত ছোটাছুটি করবে আকাশে । কিন্তু কেউ রমির ইচ্ছা পূরণ করতে পারবেনা ।





Diary

বুকের ভিতর এমন করে পোড়ায় কেনো ? বলতে পার ? যার জন্য পোড়ে এ মন তার কি কিছু হয় ? কিছুই হয়না ....

Wednesday, 12 December 2012

সিদ্ধান্ত

রমির আজকাল প্রায়ই মনে হয়, মানুষ এর যদি ঘুমের দরকার না পড়ত খুব ভালো হত ।প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটাতে ওর  সারাদিন লেগে যায়।
আজ ঘুম থেকে উঠে আয়নায় নিজেকে দেখল অনেকক্ষণ । মাঝে মাঝে ও কিছু ভাবতে পারেনা, কিছু বুঝতে পারেনা শুধু তাকিয়ে থাকে নিজের দিকে । কিছুক্ষণ পর বেডসাইড টেবিল এ রাখা দুজনের ছবিটা হাতে তুলে নিল । দেখল অনেকক্ষণ । ওদের দুজনের প্রথম ঘুরতে যাওয়া বিয়ের পরে । সেন্টমার্টিন এ । ছবিটা কে ও সরাতে পারেনি চোখের সামনে থেকে । কোনদিন পারবে বলে মনে হচ্ছেনা এই মুহুর্তে ।
আজ প্রায় সাত মাস হতে চলল অনুপম সাথে নেই । ২৫ নভেম্বর রাতে ওর  সাথে শেষ কথা হয়েছে ।  অনুপম জানিয়ে দিয়েছে ওর  চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত । অনুপম নতুন করে সব শুরু করতে চায় । নতুন সংসার করতে চায় । তাই রমিকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত সে চূড়ান্ত করে ফেলেছে । 

গতকাল অনেক রাতে বাসায় ফিরেছে রমি । অপেরা হাউস এর পাশে অনেক রাত পর্যন্ত বসে ছিল । একা । এর আগে আরো অনেক বার এসেছে । কিন্তু একা এই প্রথম । চুপচাপ বসে একটানা জলের শব্দ শুনতে শুনতে ও নিজের ভবিষ্যত টা  কে ভাবার চেষ্টা করছিল । বিভিন্নভাবে ।  অনুপমকে ছাড়া তার জীবন টা কেমন হতে পারে । রুদ্রের একটা কবিতা মনে পড়ল ওর ..
                                              "আকাশ থেকে ছিটকে পড়া
                                               তারার মতো কখন জানি
                                               অসংলগ্ন একলা আমি ছিটকে এসে
                                               আটকে গেছি নীল শহরে...
"


ও আসলেই আটকে গেছে এই নীল শহরে । দেশে ফিরে যাবার আর কোনো রাস্তা নেই । সবাই ওকে বলেছে দেশের সামাজিক পরিস্থিতিতে একটা একলা মেয়ের জীবনযাপন অনেক কষ্টের । সেটা নাকি এই লৌহপুরির একাকিত্বের কষ্টের থেকেও অনেক অনেক বেশি । রমি মনে মনে ভাবে হবে হয়ত । এতদিন নিজেই ওর  জীবনের সব বড় বড় সিদ্ধান্ত গুলো নিয়েছে । অনুপমকে বিয়ে করা, চাকরি ছেড়ে ওর সাথে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি  দেওয়া । কিন্তু এখন ও ভয় পায় আবার নিজের সিদ্ধান্তে কিছু করতে । আট বছর পরে এসে ওর  সব সিদ্ধান্তই যে আজ ভুল প্রমাণিত হয়ে গেছে ।

আশেপাশে ওয়াইন এর গন্ধ রমিকে অনুপমের পছন্দের পারফিউম এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল  । গ্লাসের শব্দ, ওয়েটার এর ছোটাছুটি, হাসির কলরোল, লাইভ মিউজিক, সবকিছুর মধ্যেও এক কোনায় ও একা বসে রইলো চুপচাপ। একজন ওয়েটার ওর  কাছে এসেও ফিরে গেল কিছু না বলে ।

ওর মনে হলো অনুপম কি আসে এখানে ? এইভাবে কি বসে থাকে একা ? নাকি আসে বন্ধুদের সাথে, এসে  মিশে যায় এই আনন্দ আয়োজনে ।
সিডনী তে এখন গ্রীষ্মকাল । রাতে যদিও বাতাসটা ঠান্ডা হয়ে যায় । তবু রমি আজকে শাড়ি  পরেছে। জলে ভেজা ঠান্ডা বাতাসটা শরীরটাকে ছুয়ে যাচ্ছিল । ও চুপচাপ শুধু তাকিয়ে ছিল  ঢেউ এর দিকে । মাঝে মাঝে ওয়াটার ট্যাক্সি এসে জেটিতে ভিড়ছিল আর ঢেউ বাড়িয়ে দিচ্ছিল  ।

হারবার ব্রিজের দিকে তাকিয়ে মনে হলো এইত সেদিন নিউ ইয়ার এর দিনে ওরা দুপুর থেকে অপেক্ষা করছিল ফায়ারওয়ার্কস দেখার জন্য । প্রচন্ড  রোদের  কারণে ওরা ছাতি দিয়ে তাবু তৈরী করেছিল ।

রমি অবাক হয় মাঝে মাঝে । এত কিছুর পর ও  কেন অনুপম কে ভুলতে পারেনা ?  অনেকে বলেছিল এই  আবেগ নির্ভরশীলতা । কিন্তু চাকরি পেল তারপর ও কেন মনে পড়ে ? এটা কোন ধরনের নির্ভরশীলতা ? মানসিক ? অনুপম যাবার সময় বলেছিল মানসিক নির্ভরশীলতা ওর অপছন্দ নয় । ওর  অপছন্দ অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ।
এই ভাবনাগুলো ওকে শান্তিতে থাকতে দেয়না । মাঝে মাঝে মনে হয় এমন কিছু কি হয়েছে যা অনুপম ওকে বলতে পারেনি । তাই সরে গেছে নিজে থেকে ।

ছবিটা কে এতক্ষণ জড়িয়ে ধরে রেখেছিল রমি । খুব যত্ন করে আবার রেখে দিল বেডসাইড টেবিল এ । ও সিদ্ধান্তে পৌঁছলো অনুপম এর জন্য ওর এই অনুভূতির এক বর্ণ ও মিথ্যে নয় । এর সঙ্গে নির্ভরশীলতার কোনো সম্পর্ক নেই । ও ঠিক করলো  দুজনের আরো কিছু ছবি বড় করে বাঁধিয়ে রাখবে ওর ঘরে ।

খলিল গিবরান এর একটি উক্তি মনে পড়ল ওর ..." “Ever has it been that love knows not its own depth until the hour of separation.”

Monday, 10 December 2012

অভিমান

দুপুর থেকেই অনিন্দিতা খুব ব্যস্ত । আজ বাড়ীতে কিছু বন্ধু আসবে । ঠিক ওর বন্ধু নয় ওর স্বামী অনুপম এর ।

প্রায় ৩ মাস হলো সিঙ্গাপুর এ এসেছে অনিন্দিতা । একটা শেয়ার্ড বাসায় উঠেছে ।এ বাসায় আরো কিছু চাইনিজ থাকে ।

অনিন্দিতা বেশ দ্রুত কাজ করছিল । কারণ রান্না শেষ করে ওকে ঘর গোছাতে হবে তারপর সে গোসল করবে । এটা ওর বাঁধাধরা নিয়ম । ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখাটা একটা বাড়াবাড়ি রকমের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে অনিন্দিতার ক্ষেত্রে ।অন্তত অনুপম এর সেরকমই মত । তবে বাড়িতে থাকলে অনুপম অনেক কাজেই ওকে সাহায্য করে । আর কিছু কাজ অনুপম এর জন্য তোলা থাকে ছুটির দিনে করবে বলে । কাপড় ইস্ত্রি আর বাথরুম ধোয়া এটা কখনোই করেনা অনিন্দিতা ।

বন্ধুমহলে রান্নার বেশ সুনাম রয়েছে ওর । তবে এ কৃতিত্বটা যত না অনিন্দিতার তার চেয়ে বেশি অনুপম এর প্রচার এর এমনটা ভাবে মনে মনে অনিন্দিতা । নতুন কিছু রান্না হলে সেগুলোর ছবি আপ করবে অনুপম বা বিভিন্ন জায়গায় কমেন্ট করে বউ এর রান্নার সুনাম করবে । অনিন্দিতা অবশ্য মনে মনে খুশিই হয়, কারণ এটা সত্যি রান্না সে ভালই করে ।

কোনো কিছু হলেই ও রান্না করে সেলিব্রেট করতে চায় । এই যেমন কিছুদিন আগে ওরা একটা DSLR ক্যামেরা কিনলো ।ঐদিন অনেক কিছু রান্না করলো অনিন্দিতা । আর অনুপম নতুন ক্যামেরা দিয়ে ওর ছবি তুলল বেশকিছু রান্নাঘরেই ।
অনুপম এর ছবি তোলার সখ আছে । অনুপম এর বাবার ও আছে এই শখ । অনিন্দিতা শুনেছে ছোটবেলায় অনুপমকে ওর বাবা মাঝে মাঝে একটা পুরো ফিল্ম কিনে দিত ছবি তোলবার জন্য ।

আজ খিচুড়ী রান্না করছে অনিন্দিতা । হঠাৎ ওর তেতুল খেতে ইচ্ছা হলো । ও যখন রান্নার টেনশন এ থাকে তখন  খেতে পারেনা । তাই ভাবলো একটু তেঁতুল খাবে । ফ্রিজ থেকে বের করলো তেঁতুল এর প্যাকেট । জমে একেবারে যেন পাথর হয়ে আছে । ও একটা ছুরি নিয়ে এক হাতে তেঁতুল এর চাকা টা ধরে অন্য হাতে ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে কিছুটা তেঁতুল কেটে বের করতে গিয়ে হাত ফসকে সোজা অন্য হাতে ঢুকে গেল ছুরি ।

প্রচন্ড ব্যাথায় ও বসে পড়েছে ততক্ষণ । রান্নাঘর থেকে দৌড়ে ঘরে চলে গেল । ঘরে যেয়ে অনুপম কে ফোন করবে বলে ফোন টা  তুলেছে কিন্তু কি ভেবে যেন আবার রেখে দিল ।

ও কথোপকথন টা কল্পনা করে নিল । শুনে প্রথমেই অনুপম বলবে এন্টিসেপটিক লাগাও । একটু অপেক্ষা কর দেখো রক্ত পড়া  বন্ধ হয় কিনা । আর তাছাড়া এত ছোট  কারণে ও কিভাবেই বা অফিস থেকে আসবে । অনুপম একটু এরকমই । ভীষণ প্রাকটিক্যাল । অন্য ছেলেদের মত ন্যাকা ন্যাকা ভাব দেখায়না বউ এর প্রতি । অনিন্দিতা জানে কিন্তু তারপর ও মনের কোনায় কোথায় যেন একটু অভিমান জমে রইলো ।

আবার নিজের হাতের দিকে তাকালো । হাতটা মুহুর্তে ফুলে গেছে আর কাটা জায়গার চারপাশ জুড়ে রক্ত জমে গেছে । তীব্র যন্ত্রনাটাও কমছেনা ।ও কি করবে বুঝতে পারছেনা । পাশের ঘরে জেস নামের একটা চাইনিজ মেয়ে থাকে ওকে ডাকলো । জেস  স্যাভলন আর তুলো দিয়ে মোটামুটি রকমের একটা ব্যান্ডেজ করে দিল । এখন হাতটা এত অবশ যে ও আর কোনো ব্যাথা অনুভব করছেনা । ও রান্নাঘরে ফিরে গেল । কাজ শেষ করতে হবে ওকে । কোনরকমে রান্না শেষ করে গোসল করে নিল ।

অবশ ভাবটা কেটে যাওয়ার পর ব্যথাটা আবার ফিরে এসেছে । ফোলাটাও যেন বেড়ে গেছে অনেকগুণ । আর কাটা জায়গা থেকে কেমন যেন সাদা মাংশ বেরিয়ে এসেছে । এবার ও ফোন করলো অনুপমকে । অনুপম শুনে বলল নিচে ডাক্তার এর কাছে যেতে । কিন্তু অনিন্দিতা ব্যাগ খুলে দেখল টাকা নেই । এরকম কখনো হয়নি । অনুপম কখনো ওকে টাকা দিয়ে যেতে ভোলেনা । অনিন্দিতা ঘুমিয়ে থাকলেও ওকে ডেকে বলে যায় যে  টাকা থাকলো । এটা অনুপম এর অভ্যাস । দোষটা অনিন্দিতার ই । ও কখনো নিজের ব্যাগ খুলে দেখেনা যে টাকা আছে কিনা । আসলে টাকা ওভাবে  ঠিক লাগেওনা । বাইরে গেলে অনুপম সবসময় সাথেই থাকে । ও আবার ফোন করলো অনুপম কে ।

কিছুক্ষণ পরে অনুপম চলে আসল অফিস থেকে । একজন জিপি কে দেখিয়ে হাত টা ব্যান্ডেজ করতে হলো । কম্পাস হাইট এর নিচে থেকে ডাক্তার দেখিয়ে ওরা যখন ফিরছিল অনুপম ওকে একহাতে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল । অনিন্দিতার তখন নিজেকে ভীষণ  অপরাধী মনে হচ্ছিল । এই মানুষটার উপরে মিছেই অভিমান করে ও ।