Tuesday, 8 October 2013

ছায়ার সঙ্গে কথোপকথন

এতটা আত্মবিস্মৃত এখনও হইনি আমি
হইনি বিচ্ছিন্ন বিমগ্ন নিজের সত্ত্বা থেকে
আমার শিরা উপশিরা এখনও প্লাবিত হয়নি আত্মপ্রতারণার নীল বিষে  
যে আমাকে তুমি পরিচয় করিয়ে দেবে আমার অস্তিত্বের কণ্ঠস্বর এর সঙ্গে
ক্ষীণ দ্বিধান্বিত কণ্ঠে যখন বলে ওঠো “...শুনছো ? আমি ...আমি বলছি”
টিয়া পাখির এক একটি ঘন সবুজ পালক উড়ে উড়ে এসে জমা হয় বুকের বন্ধ তোরঙ্গে
তোরঙ্গের প্রতিটি খাঁজের খাজাঞ্চিখাতায় থেকে যায় পেজমার্ক হয়ে
আমি একটুকুও অবাক নই, উচ্ছসিত নই, হতবিহ্বল নই
কেননা আমি চিনি তোমার কণ্ঠস্বর, আমার অস্তিত্বের কণ্ঠস্বর
পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত – হোক তা দুর্গম, গহীন কিংবা সমতল ব-দ্বীপ এর কোন ছায়াসুনিবিড় গ্রাম –
থেকেই তা ভেসে আসুকনা কেন, আমি চিনি
কারণ আমি চিনি আমার অস্তিত্বকে
আমি চিনি আমার নিজের ছায়া
আমার ‘আমি’ কে আমি চিনি
শুধু তুমিই চেননি আমাকে  ...


চলেই যদি যাবে তবে কেন এসেছিলে

চলেই যদি যাও
কেন রয়ে যাও বুকের ভেতর এত গভীর করে ?
একটুখানি হোঁচট খাওয়া ব্যাথার মত
বাক্সবন্দী চিঠির হলদে হয়ে যাওয়া পাতার মত
দেয়ালের গায়ে লেগে থাকা শেষ বিকেলের বিষণ্ণ একটুকরো রোদ্দুরের মত
যত্নে বোনা মেখলার ভাঁজে ভাঁজে রাখা দারুচিনি আর এলাচ এর সুবাস এর মত
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কেউ যেন ডাকল ভেবে পেছন ফিরে তাকানোর মত
কেন রয়ে যাও ?
চলেই যদি যাও,
মুঠোফোনের ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসা “...আমি” ধ্বনি হয়ে
কেন ফিরে ফিরে আস কুয়াশাঘেরা স্মৃতির কানাগলিতে ?
ফেলে রেখে খেলাধুলার সরল সংসার, চলেই যদি গেলে  
শুন্য কেন করে দিয়ে গেলেনা স্মৃতির ভাঁড়ার ?  
আনাড়ি হাতে গীটার এর তারে তোলা টুংটাং শব্দের মত
হৃদয়ের ছিলায় তুলে টান, চলেই যদি যাবে

তবে কেন এসেছিলে ? 

Saturday, 5 October 2013

শূন্যতায় কার ছায়া

কুয়াশাভেজা চাঁদের ম্লান আলোয় ভেসে যায় নিস্তব্ধ চরাচর
বুকের হাঁপর থেকে বেরিয়ে আসে গাঢ় দীর্ঘশ্বাস
নিদারুণ হাহাকার ফিরে ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে
খাঁ খাঁ করা শূন্যতায় কার ছায়া পড়ে ?
কে ওখানে ?
ঘামে ভেজা পিঠ, অবসন্ন পা
বিষাদগ্রস্ত মুখ
কে ? কে তুমি পেরিয়ে যাও বুকের সীমান্তের কাঁটাতার ?
কে নাড়িয়ে যাও বন্ধ দুয়ার ?
পথিক ! ক্লান্ত পথিক !
পেরিয়ে এলে বুঝি সুনীল সাগর ?
অথৈ প্লাবন ? ব্লাষ্টফার্নেস এর মত জ্বলে যাওয়া প্রান্তর ?
এলে বুঝি জয় করে সুউচ্চ পর্বতশিখর ?
অলিম্পাস এর পাদদেশ এ দেবী হেরার মন্দির এ---
নতজানু হয়ে প্রার্থনায় প্রার্থনায় বুঝি আমাকেই খুঁজছিলে তুমি ?
মেলেনা উত্তর –
শুধু প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে দীর্ঘশ্বাস
ফিরে আসে হাহাকার

ফিরে আসে শূন্যতা ...

মাচ্চু-পিচ্চুতে অস্তিত্বের ছায়া

ছায়া ছায়া শরীরে দীর্ঘক্ষণ হেঁটে চলেছি পাশাপাশি দুজন
সাদা সাদা মেঘের কাঁথায় ঢেকে গিয়েছে পাণ্ডুরবর্ণ চাঁদ ততক্ষণে
চারিদিকে তরল অন্ধকার  
নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায়না
হঠাৎ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি
এ কোন অচেনা তুমি !
ছুঁতে গেছি যেই
সরে গেলে দূরে
ক্রমাগত দূরে যেতে যেতে পৌঁছে গেলে মাচ্চু-পিচ্চুর উচ্চতায়
তোমার অস্তিত্বের ছায়া ক্রমাগত বড় হতে হতে
পাদদেশে দাঁড়ানো আমাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে
আমার বুকের ভেতর তখন দুড়মুশ পেটার শব্দ শুধু ---
ঘেমে নেয়ে একাকার আমি
চোখ খুলে দেখি সাদা মেঘের কাঁথা ছেড়ে জেগে উঠেছে পাণ্ডুরবর্ণ চাঁদ,
তার হলদেটে আলোয় প্লাবিত হচ্ছে বহু পুরনো একটি যুগল ফটোগ্রাফ; আর
একটা আস্ত মানুষ গিলে খাবার ক্ষুধা নিয়ে হা হা করছে
আমার একতলার পরিপাটী সাজানো ঘর
শুধু তুমি রয়ে গেলে মাচ্চু-পিচ্চুর উচ্চতায়

আমার ঘুমটুকু কেড়ে নিয়ে --- 

শুধু তোমার কথা ভেবে

তোমার কথা ভেবে ভেবে আমার রাত কাটলো
আমার সকাল হল তোমার কথা ভেবে   
হাঁসের ডিমের খোলসের মত নীলচে আকাশ জুড়ে সোনালী রঙ ধরল
তারপর সূর্য উঠি উঠি করেও আর উঠলোনা
নীলচে বেগুনী আকাশটা ধীরে ধীরে হয়ে গেল তোমার ছাই রঙা টি-শার্ট 
তোমার ওই ছাই রঙের বিস্তৃত আকাশে মুখ গুঁজে
কত কত রাত্রি-দিন কেটেছে আমার; কুম্ভকর্ণের মত ঘুমে
আজ সারাদিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হল তোমার কথা ভেবে
আমার বেলা গেল, সন্ধ্যে হল
আজ আমার কোন কাজ হলনা শুধু তোমার কথা ভেবে  


Tuesday, 17 September 2013

ভেজা এই শহরটা

ভিজছে বিদ্যুতের পোল, সাইনবোর্ড, ল্যাম্পপোস্ট
ভিজছে নিমগ্ন কারপার্কিং
ভিজে যাচ্ছে বারান্দায় ঝুলে থাকা নিঃসঙ্গ তোয়ালে
ভিজতে ভিজতে দর হেঁকে চলে নিলামি
পারলে ভেজা এই শহরটাকে বিকিয়ে দেয় জলের দরে
বর্ষাতি আর ছাতির আড়ালে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে যান্ত্রিক মানুষ
কেউ কেউ আড়চোখে একবার দেখে নেয় সবজি দোকানীর হাঁকাহাঁকি
ভিজে হাওয়ায় ভিজে ভিজে সুর ছড়াচ্ছে উইন্ডচাইমস
ভিজে যাচ্ছে এই শহর
ভিজে যাচ্ছে যান্ত্রিকতা
হায়েডিজ এর শোকের অশ্রুতে,
ধুয়ে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে, ভিজে ভিজে কুঁকড়ে যাচ্ছে এই একাকী বিষণ্ণ শহর ...

মস্তিষ্কের ঘেরাটোপে বাংলা মোটর


কাঠমল্লিকায় ছাওয়া বাঁধানো উঠোন ।
গতরাতের বৃষ্টিতে জলজমা কোণটা হরিণীর চঞ্চলতায় পেরিয়ে,এক লাফে লাল ইটের সিঁড়িতে পা ।
সমুদ্র সবুজ শাড়ীর আঁচলটা একটু ঠিক করে নিতে নিতে, হঠাৎ পিছু ফিরে অফিসঘরটা একটু দেখে নিয়েই একছুটে চিলেকোঠার ঘরের সামনে ।
কাঠের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ।
কেউ আছেন ?
-ও আপনি !
অন্য কাউকে আশা করছিলেন ?
-না মানে ঠিক তা নয়  
তাহলে ?
-বসুন  
পড়ছিলেন ?
-এই আরকি … আচ্ছা আপনি রেলের ফেরীর গল্প শুনেছেন?
রেলের ফেরী !!
রেল বুঝি ফেরী করে নদী পাড়ি দেয় !!
-কি ভীষণ বোকা আপনি  
-হাসছেন যে ?
আচ্ছা আর হাসবোনা … বলুন আপনার রেলের ফেরীর গল্প 

-চা খাবেন ?
আপনি বানাবেন ?
-কেন ? পারিনা ভেবেছেন ?  
কই আপনার গল্প বলুন !

-একসময় গোয়ালন্দ ঘাট থেকে ছাড়ত  রেলের ফেরী । গোয়ালন্দে এসে থামা রেলের যাত্রীরা, রেল থেকে নেমে ফেরী করে নদী পার হয়ে,ওপারে অপেক্ষা করতে থাকা রেলে চড়ে আবার রওনা দিত যে যার গন্তব্যে।
-তারপর ?
তারপর ধরুন সেই রেলের কোন যাত্রীর হয়ত নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই
-তো আপনার সেই যাত্রীটি কি কোন নারী ?
সেটা বলবনা । ভেবে নিন আপনার যা ইচ্ছে হয় । আচ্ছা আপনি ঘুরতে ভালবাসেন ? গন্তব্যহীন, উদ্দেশ্যহীন...
-প্রচণ্ড ।  
আমার সঙ্গে যাবেন ? পাহাড়ে, জঙ্গলে, সমুদ্রে ...

-আচ্ছা ধরুন সত্যি এমন যদি হত ! রেলের কামরায় মুখোমুখি বসা যাত্রীরা পড়ন্ত বিকেলের অদ্ভুত ম্লান আলোয় ফেরী করে পাড়ি  দিচ্ছে পদ্মা । কেমন হত ?
মন্দ না, সূর্যটা ঠিক লাল রুবির মত আলো ফেলবে রমণীর নরম গালে । আর তাকে দেখলে মনে হবে যেন দেবী ভেনাস সদ্য স্নান করে উঠে এসেছেন মর্ত্যে । গোলাপের মতই প্রস্ফুটিত তার ওষ্ঠ । দীর্ঘ কেশরাজি থেকে বিন্দু বিন্দু গড়িয়ে পড়বে জল ।     
-তাহলে স্বীকার করলেন আপনার সেই যাত্রীটি একজন নারী ।
না আগে ভাবিনি । আপনি পড়ন্ত বিকেলের অদ্ভুত আলোর কথা বললেন তখন মনে পড়ল ভেনিস নগরীর কথা, দেবী ভেনাস এর কথা । আপনি সমুদ্র পাড়ি দেবেন আমার সাথে ?

ঘুলঘুলির নকশার ভিতর দিয়ে আলো এসে, অদ্ভুত এক লুকোচুরি খেলে চলে বিছানায় । শেষ বিকেলের নরম আলো । কাঁঠালবাগানের ভিতরের দিকের লোহালক্কড়ের দোকান থেকে ভেসে আসে একটানা হাতুড়ি পেটার শব্দ । ঢাকার বৃষ্টিধোয়া বাতাসে কাঠমল্লিকার গন্ধ মিলেমিশে এক হয় সমুদ্র সবুজ শাড়ি, নীল টিপ এর সাথে ।

এদিকে চিলেকোঠার ঘরে কেরোসিন এর স্টোভ এ চায়ের পানি ইতোমধ্যেই শুকিয়ে গেছে ...