Friday, 11 October 2013

একজন চা প্রেমিকের জন্য


মেয়েটি কখনো চা ভালবাসেনি
চিনির সঙ্গে চা-পাতা পুড়িয়ে তার রঙ দিয়ে
কখনো আঁকেনি আলপনা হাতে
কিন্তু সে ভালবেসেছিল তার প্রেমিক কে
ভালবেসেছিল চা বাগানের পাহাড়-জঙ্গল, নুড়ি বিছানো নদী পথ  
আর তার প্রেমিক ভালবেসেছিল সমুদ্র, উত্তাল উন্মাতাল সমুদ্র
কী ভীষণ বৈপরীত্য !
যদিও চা ভালবাসেনি মেয়েটি কিন্তু নতুন সংসারে সে কিনে আনল দুটি চায়ের কাপ  
জুঁই সাদা, দোকানে দোকানে খুঁজে ফিরলো আসাম, সিকিম, দার্জিলিং চা 
সমস্ত শহর তন্নতন্ন করে খুঁজল একটি সমুদ্র সবুজ টি-পট,  
আর জংলা ছোপের টি-কোজি... মনে মনে পাখা মেলে কল্পনা
সমুদ্র সবুজ টি-পট, ঢেকে যাবে জংলা ছোপের টি-কোজি তে  
আর তার ভিতরে ধীরে ধীরে রঙ ছড়াবে
আসামের বিসাকপি কিংবা বিজু এস্টেট এর কড়া ঘ্রাণ এর চা, মেয়েটি ভাবে
নিশ্চয় কোন এক নুড়ি বিছানো নদীর জল বর্ষার ঢল হয়ে ছুঁয়ে গেছে এ চায়ের পাতা
ভেবে ভেবে নিজের অজান্তেই হেসে ওঠে মেয়েটি  
মেয়েটি চা ভালবাসেনি, ভালবেসেছিল নুড়ি বিছানো নদী পথ 
ভালবেসেছিল তার সমুদ্রসম প্রেমিককে
তাই সে খুঁজেছিল
ছোট্ট একটি টি-পট, যাতে শুধু মাত্র দুজনের- একান্ত দুজনের চা ধরে
মেয়েটি চা ভালবাসেনি বটে, কিন্তু তার প্রেমিক তো বেসেছিল   
তবুও তার কখনো কেনা হয়ে ওঠেনি ছোট্ট টি-পট, জংলা ছোপ টি-কোজি
তার আগেই উত্তাল সমুদ্র ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তার প্রেমিককে, তার সংসার
রয়ে গেছে শুধু ডিএসএলআর এর ক্লিকে ফ্রেমে বন্দী হওয়া  
জুঁই সাদা চায়ের কাপ, হাসিমুখ আর তার বিপরীতে
পড়ন্ত সোনালী বিকেল আর জুঁই এর গন্ধভরা হু হু করা চৈত্রের বাতাস


Tuesday, 8 October 2013

ছায়ার সঙ্গে কথোপকথন

এতটা আত্মবিস্মৃত এখনও হইনি আমি
হইনি বিচ্ছিন্ন বিমগ্ন নিজের সত্ত্বা থেকে
আমার শিরা উপশিরা এখনও প্লাবিত হয়নি আত্মপ্রতারণার নীল বিষে  
যে আমাকে তুমি পরিচয় করিয়ে দেবে আমার অস্তিত্বের কণ্ঠস্বর এর সঙ্গে
ক্ষীণ দ্বিধান্বিত কণ্ঠে যখন বলে ওঠো “...শুনছো ? আমি ...আমি বলছি”
টিয়া পাখির এক একটি ঘন সবুজ পালক উড়ে উড়ে এসে জমা হয় বুকের বন্ধ তোরঙ্গে
তোরঙ্গের প্রতিটি খাঁজের খাজাঞ্চিখাতায় থেকে যায় পেজমার্ক হয়ে
আমি একটুকুও অবাক নই, উচ্ছসিত নই, হতবিহ্বল নই
কেননা আমি চিনি তোমার কণ্ঠস্বর, আমার অস্তিত্বের কণ্ঠস্বর
পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত – হোক তা দুর্গম, গহীন কিংবা সমতল ব-দ্বীপ এর কোন ছায়াসুনিবিড় গ্রাম –
থেকেই তা ভেসে আসুকনা কেন, আমি চিনি
কারণ আমি চিনি আমার অস্তিত্বকে
আমি চিনি আমার নিজের ছায়া
আমার ‘আমি’ কে আমি চিনি
শুধু তুমিই চেননি আমাকে  ...


চলেই যদি যাবে তবে কেন এসেছিলে

চলেই যদি যাও
কেন রয়ে যাও বুকের ভেতর এত গভীর করে ?
একটুখানি হোঁচট খাওয়া ব্যাথার মত
বাক্সবন্দী চিঠির হলদে হয়ে যাওয়া পাতার মত
দেয়ালের গায়ে লেগে থাকা শেষ বিকেলের বিষণ্ণ একটুকরো রোদ্দুরের মত
যত্নে বোনা মেখলার ভাঁজে ভাঁজে রাখা দারুচিনি আর এলাচ এর সুবাস এর মত
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কেউ যেন ডাকল ভেবে পেছন ফিরে তাকানোর মত
কেন রয়ে যাও ?
চলেই যদি যাও,
মুঠোফোনের ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসা “...আমি” ধ্বনি হয়ে
কেন ফিরে ফিরে আস কুয়াশাঘেরা স্মৃতির কানাগলিতে ?
ফেলে রেখে খেলাধুলার সরল সংসার, চলেই যদি গেলে  
শুন্য কেন করে দিয়ে গেলেনা স্মৃতির ভাঁড়ার ?  
আনাড়ি হাতে গীটার এর তারে তোলা টুংটাং শব্দের মত
হৃদয়ের ছিলায় তুলে টান, চলেই যদি যাবে

তবে কেন এসেছিলে ? 

Saturday, 5 October 2013

শূন্যতায় কার ছায়া

কুয়াশাভেজা চাঁদের ম্লান আলোয় ভেসে যায় নিস্তব্ধ চরাচর
বুকের হাঁপর থেকে বেরিয়ে আসে গাঢ় দীর্ঘশ্বাস
নিদারুণ হাহাকার ফিরে ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে
খাঁ খাঁ করা শূন্যতায় কার ছায়া পড়ে ?
কে ওখানে ?
ঘামে ভেজা পিঠ, অবসন্ন পা
বিষাদগ্রস্ত মুখ
কে ? কে তুমি পেরিয়ে যাও বুকের সীমান্তের কাঁটাতার ?
কে নাড়িয়ে যাও বন্ধ দুয়ার ?
পথিক ! ক্লান্ত পথিক !
পেরিয়ে এলে বুঝি সুনীল সাগর ?
অথৈ প্লাবন ? ব্লাষ্টফার্নেস এর মত জ্বলে যাওয়া প্রান্তর ?
এলে বুঝি জয় করে সুউচ্চ পর্বতশিখর ?
অলিম্পাস এর পাদদেশ এ দেবী হেরার মন্দির এ---
নতজানু হয়ে প্রার্থনায় প্রার্থনায় বুঝি আমাকেই খুঁজছিলে তুমি ?
মেলেনা উত্তর –
শুধু প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে দীর্ঘশ্বাস
ফিরে আসে হাহাকার

ফিরে আসে শূন্যতা ...

মাচ্চু-পিচ্চুতে অস্তিত্বের ছায়া

ছায়া ছায়া শরীরে দীর্ঘক্ষণ হেঁটে চলেছি পাশাপাশি দুজন
সাদা সাদা মেঘের কাঁথায় ঢেকে গিয়েছে পাণ্ডুরবর্ণ চাঁদ ততক্ষণে
চারিদিকে তরল অন্ধকার  
নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায়না
হঠাৎ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি
এ কোন অচেনা তুমি !
ছুঁতে গেছি যেই
সরে গেলে দূরে
ক্রমাগত দূরে যেতে যেতে পৌঁছে গেলে মাচ্চু-পিচ্চুর উচ্চতায়
তোমার অস্তিত্বের ছায়া ক্রমাগত বড় হতে হতে
পাদদেশে দাঁড়ানো আমাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে
আমার বুকের ভেতর তখন দুড়মুশ পেটার শব্দ শুধু ---
ঘেমে নেয়ে একাকার আমি
চোখ খুলে দেখি সাদা মেঘের কাঁথা ছেড়ে জেগে উঠেছে পাণ্ডুরবর্ণ চাঁদ,
তার হলদেটে আলোয় প্লাবিত হচ্ছে বহু পুরনো একটি যুগল ফটোগ্রাফ; আর
একটা আস্ত মানুষ গিলে খাবার ক্ষুধা নিয়ে হা হা করছে
আমার একতলার পরিপাটী সাজানো ঘর
শুধু তুমি রয়ে গেলে মাচ্চু-পিচ্চুর উচ্চতায়

আমার ঘুমটুকু কেড়ে নিয়ে --- 

শুধু তোমার কথা ভেবে

তোমার কথা ভেবে ভেবে আমার রাত কাটলো
আমার সকাল হল তোমার কথা ভেবে   
হাঁসের ডিমের খোলসের মত নীলচে আকাশ জুড়ে সোনালী রঙ ধরল
তারপর সূর্য উঠি উঠি করেও আর উঠলোনা
নীলচে বেগুনী আকাশটা ধীরে ধীরে হয়ে গেল তোমার ছাই রঙা টি-শার্ট 
তোমার ওই ছাই রঙের বিস্তৃত আকাশে মুখ গুঁজে
কত কত রাত্রি-দিন কেটেছে আমার; কুম্ভকর্ণের মত ঘুমে
আজ সারাদিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হল তোমার কথা ভেবে
আমার বেলা গেল, সন্ধ্যে হল
আজ আমার কোন কাজ হলনা শুধু তোমার কথা ভেবে  


Tuesday, 17 September 2013

ভেজা এই শহরটা

ভিজছে বিদ্যুতের পোল, সাইনবোর্ড, ল্যাম্পপোস্ট
ভিজছে নিমগ্ন কারপার্কিং
ভিজে যাচ্ছে বারান্দায় ঝুলে থাকা নিঃসঙ্গ তোয়ালে
ভিজতে ভিজতে দর হেঁকে চলে নিলামি
পারলে ভেজা এই শহরটাকে বিকিয়ে দেয় জলের দরে
বর্ষাতি আর ছাতির আড়ালে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে যান্ত্রিক মানুষ
কেউ কেউ আড়চোখে একবার দেখে নেয় সবজি দোকানীর হাঁকাহাঁকি
ভিজে হাওয়ায় ভিজে ভিজে সুর ছড়াচ্ছে উইন্ডচাইমস
ভিজে যাচ্ছে এই শহর
ভিজে যাচ্ছে যান্ত্রিকতা
হায়েডিজ এর শোকের অশ্রুতে,
ধুয়ে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে, ভিজে ভিজে কুঁকড়ে যাচ্ছে এই একাকী বিষণ্ণ শহর ...